ফের লজ্জাজনক ভুল সরকারি বিজ্ঞপ্তিতে, মুখর ভাষাবিদরা

অশোক সেনগুপ্ত
আমাদের ভারত, কলকাতা, ৮ ফেব্রুয়ারি: সম্প্রতি মুখ্যসচিবের পাঠানো বিধানসভা অধিবেশন শুরু সংক্রান্ত নথিতে পিএম হয়ে গিয়েছিল এএম। একটা ছোট্ট ভুল কিভাবে মুখ পোড়াতে পারে সরকারের, সম্প্রতি আমরা তা দেখেছি। পশ্চিমবঙ্গ সরকারের এক বিজ্ঞপ্তিতে ফের লজ্জাজনক একগুচ্ছ ভুল ধরা পড়ল। প্রশ্ন উঠছে, সরকারি চিঠি বা বিজ্ঞপ্তি প্রকাশে কি যথেষ্ঠ সতর্কতা নেওয়া হচ্ছে? ফের একটা লজ্জাজনক নজির।

খোদ মুখ্যমন্ত্রীর ফোনে ‘ভুল হয়ে গিয়েছে’ স্বীকারোক্তি, রাজভবনে গিয়ে অ্যাডভোকেট জেনারেলের দুঃখপ্রকাশ—এ সবের পরেও বিধানসভা অধিবেশন শুরুর সময়ের উল্লেখে এএম -টা পিএম করাতে দ্বিতীয়বার মন্ত্রিসভার বৈঠক ডাকতে হয়েছে। এতে ছি ছি রব পড়েছে বিভিন্ন মহলে। সম্প্রতি রাজ্যের একটি মদ ব্যবসায়ীদের চুক্তির বয়ানে ইংরেজিতে ‘এগ্‌জিকিউট’ শব্দটির বাংলা করা হয়েছে ‘মৃত্যুদণ্ড’। ইংরেজিতে রয়েছে, ‘টু বি এগ্‌জিকিউটেড অন ইন্ডিয়ান নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্প পেপার অব রুপিজ ১০০ ডেনোমিনেশন।’ তার বাংলা তর্জমা করা হয়েছে, ‘রুপির ভারতীয় নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্প পেপারে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হবে / ১০০ টাকা মূল্যমান।’

বর্ষীয়ান ভাষাবিদ তথা প্রাক্তন উপাচার্য ডঃ পবিত্র সরকার মঙ্গলবার প্রতিক্রিয়ায় এই প্রতিবেদককে বলেন, “গুগলে এরকম অশিক্ষিত অনুবাদ দেখা যায়। এটা কারা করেছে? কেউ কেউ ছাগলকে দিয়ে যব মাড়ানোর কাজ করায় পয়সা বাঁচানোর জন্য।”

আর এক প্রাক্তন উপাচার্য তথা ৩৭ বছরের বাংলার শিক্ষকতায় অভিজ্ঞতাসম্পন্ন ডঃ অচিন্ত্য বিশ্বাস মঙ্গলবার এই প্রতিবেদককে বলেন, “এরা কারা? না জানেন ইংরেজি, না বাংলা! অভিধান খোলেন? নাকি গুগুল থেকেই কাজ সারেন? অনুবাদ যে শব্দ-নির্ভর হয় না, বিষয় পরিবেশ মনে রেখে কাজটি করতে হয়। সে কাজ মেধার অপেক্ষা রাখে। মদ সংক্রান্ত অনুবাদক কি বস্তুত আবগারি পরিস্থিতির কবলে পড়েছিলেন? সরকারের বাংলা ভাষা প্রয়োগের এই আশ্চর্য উদাহরণ দেখে মাননীয় বাংলা আকাদেমি সভাপতির প্রতিক্রিয়া জানতে চাই।”

চুক্তির লিখিত বয়ান পাওয়ার পরে মদ ব্যবসায়ীদের বেশি করে ভাবাচ্ছে দু’টি শব্দ— ‘দেশীয় আত্মা’ এবং ‘মৃত্যুদণ্ড’। যা নিয়ে চিন্তার চেয়ে বেশি চলছে রসিকতা। মদ ব্যবসায়ীদের সংগঠন ‘ওয়েস্ট বেঙ্গল ফরেন লিকার, কান্ট্রি স্পিরিট অ্যান্ড অফ অ্যান্ড অন শপ অ্যান্ড হোটেল অ্যাসোসিয়েশন’-এর সাধারণ সম্পাদক গৌতম মুখোপাধ্যায়ের কথায়, ‘‘এমন বাংলা তর্জমা দেখে সত্যিই অবাক হয়ে গিয়েছি। ইংরেজি থেকে বাংলায় অনুবাদে ভুল অনেকেরই হয়। কিন্তু মনে রাখতে হবে বাংলা পণ্ডিতদের ভাষা। সেটা নিয়ে এমন করাটা আপত্তিকর। এটা বাংলা ভাষার অপমান।’’

অন্যদিকে জাতীয়তাবাদী ছাত্র সমাজের মাসিক মুখপত্র ‘বঙ্গ বিদ্যার্থী’-র সম্পাদক এবং স্টুডেন্ট ফর হোলিস্টিক ডেভলপমেন্ট অফ হিউম্যানিটি’-র জাতীয় সহ আহ্বায়ক, বাংলার শিক্ষক ডঃ সুমন চন্দ্র দাস এই প্রতিবেদককে বলেন, ‘দেশ’ এবং ‘আত্মা’ শব্দের অর্থের সঙ্গে বাংলা মদের নতুন নাম কার্যত বাংলা শব্দ ভান্ডারে শব্দার্থ তত্ত্বের বিচারে শব্দের অবক্ষয় মাত্র। এই ভাবেই বঙ্গের সংস্কৃতি এবং শব্দ ভান্ডারকে ধ্বংসের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে কিছু নিকৃষ্ট শ্রেণির মানুষ।“

সুমনবাবুর মন্তব্য, “দেশ শব্দটি একটি ভূখন্ডে জাতি বাচক আবহমান কালের রাষ্ট্র পুরুষ বাচক শব্দ। আর ‘আত্মা’ হল যাকে কোনও ভাবেই ধ্বংস করা যায় না, যা অনন্ত, যার আদি অন্ত বলে কিছু নেই, যাকে কোনও কিছু দিয়ে মাপা যায় না, যা ছোট্ট থেকে ছোট্ট আবার বৃহৎ থেকে বৃহৎ। এই আত্মা পরমাত্মার অংশ বিশেষ। আত্মা হল একটি বৃহৎ চৈতন্য প্রবাহ। এই শব্দ যুগলকে একত্রিত করে ‘বাংলা মদে’-র তর্জমা অত্যন্ত নিম্নরুচির পরিচয়। মদ বা সুরার সঙ্গে এই ‘দেশ: এবং’ ‘আত্মা’র বৃহৎ অর্থ ব্যাঞ্জক শব্দের অবনমন অত্যন্ত দুঃখজনক। যারা এই রকম শব্দ ব্যবহার করছেন তারা পরিকল্পনা করে বঙ্গ সংস্কৃতি এবং বাংলা ভাষার শব্দ ভান্ডারকে সমূলে বিনাশ করছেন। তীব্র নিন্দা জানাই এই ভাবে অর্থ ও শব্দার্থ তত্ত্বের উৎকর্ষতাকে যারা বিনাশ করছেন। বঙ্গভূমির বঙ্গদেশের আত্মা কখনই মদ নয়। বঙ্গের গীত গোবিন্দ কাব্য, বৈষ্ণব পদাবলী, মঙ্গলকাব্য, বাউল ভাষা সংস্কৃতি সাহিত্য নৃত্য তথা কীর্তন হল বঙ্গদেশের আত্মা। কখনই মদ নয়। এই অপসংস্কৃতি এবং শব্দের অপ ব্যবহারে রইল একরাশ ঘৃণা।“

মদ ব্যবসায়ী সংগঠনের নেতা গৌতম মুখোপাধ্যায় বলেন, ‘‘দেশি মদের ভাল বাংলা করতে হলে ‘দেশীয় সুরা’ করতেই পারত। জানি না কোন পণ্ডিত এটা করেছেন! তবে এমন বয়ান পাঠানোর আগে বাংলা ভাষায় বিশেষজ্ঞ কারও সঙ্গে কথা বলা উচিত ছিল।’’

খবরটি এই প্রতিবেদক রাজ্যের কিছু আমলা অথবা অবসরপ্রাপ্ত শীর্ষ আমলাকে হোয়াটসঅ্যাপে জানান। তাঁদের ২-১ জন বাদে কেউ কোনও মন্তব্য করেননি। একজন প্রশ্ন করেন, বিধানসভা অধিবেশন ডাকার জন্য রাজ্যপালকে পাঠানো বার্তায় এত বড় ভুল হল। প্রশাসনের সংশ্লিষ্ট কারও বিরুদ্ধে কোনও ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে কি? এক গণিতবিশারদ প্রাক্তন আধিকারিক প্রতিক্রিয়ায় ইংরেজিতে লেখেন, “কী চলছে সব?” খবরে প্রকাশের জন্য একটু বিস্তারিত লিখে দেবেন কিনা জানতে চাইলে কেবল চারটি ইংরেজি বড় হরফের অক্ষর লেখেন। জবাবটি পরিস্কার না হওয়ায় পুত্রের কাছে জানতে চাই। ও বলল, চার হরফের অর্থ হল ‘রোলিং অন দি ফ্লোর লাফিং’। বাচ্চারা হাসতে হাসতে গড়াগড়ি দেওয়ার দৃশ্যকে এ রকম বলা হয়।“

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *