এক জেদি মহিলা উপাচার্য, বনাম শাসক দলের একাংশ

অশোক সেনগুপ্ত
আমাদের ভারত, কলকাতা, ১৭ নভেম্বর: বিধি না মানায় বিএড বিশ্ববিদ্যালয় (বাবা সাহেব অম্বেদকর এডুকেশন ইউনিভার্সিটি) রাজ্যের ২৫৩টি কলেজের ইচ্ছুক পড়ুয়াদের বি এড পরীক্ষায় বসার অনুমতি দেয়নি। বিষয়টি নিয়ে জল ঘোলা হচ্ছে বিস্তর। ঘটনাটির গভীরে গেলে দেখা যাচ্ছে সিদ্ধান্তটা ১৬ আনা সঠিক। কিন্তু শিক্ষামন্ত্রী ব্রাত্য বসু এবং ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিচালনমণ্ডলির অন্যতম সদস্য মনোজিৎ মণ্ডল একতরফাভাবে উপাচার্য অধ্যাপক ডঃ সোমা বন্দ্যোপাধ্যায় সম্পর্কে এমন কিছু মন্তব্য করেছেন, যা ভিত্তিহীন এবং কিছু ক্ষেত্রে অপমানজনক। কারণ, সোমা চাইছেন আইন মেনে, স্বচ্ছতার সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয় চালাতে। বিরোধীদের লক্ষ্য অন্য। 

ভারতে বিএড প্রশিক্ষণের বিষয়সমূহের তত্বাবধানের জন্য ১৯৭৩ সালে তৈরি হয় ন্যাশনাল কাউন্সিল ফর টিচার্স এডুকেশন (এনসিটিই)। এদের বিভিন্ন সুপারিশ পরিমার্জনের পর ১৯৯৩ সালে প্রণীত হয় এনসিটিই আইন, যেটি রূপায়িত হতে শুরু করে ১৯৯৫ সালের ১ জুলাই। দেশের বিভিন্ন বিএড কলেজের এনসিটিই-র নির্দেশিকা মেনে চলার কথা। কিন্তু তা মানা হচ্ছিল না। এই অবস্থায় স্বচ্ছতা এবং পড়ুয়াদের নিরাপত্তার খাতিরে কড়া হাতে বিএড কলেজগুলোর বিভিন্ন অনিয়ম বন্ধ করা জরুরি হয়ে ওঠে। কয়েক বছর আগে এ রাজ্যে উপাচার্য হিসাবে সেই হাল ধরলেন ডঃ সোমা বন্দ্যোপাধ্যায়। যাঁরা আইন না মেনে এতকাল বিএড কলেজ চালিয়ে এসেছেন, তাঁদের পাল্টা চাপ বাড়তে লাগল উপাচার্যের ওপর। কিন্তু উপাচার্য সবিনয়ে সে সব প্রত্যাখ্যান করতে লাগলেন। 

শিক্ষক হওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় যে ডিগ্রি, তার প্রশিক্ষণ দেওয়া হয় বিএড কলেজে। এ রাজ্যে এই প্রশিক্ষণ দেওয়ার সরকারি কলেজ মাত্র ২৪টি। তার তুলনায় বেসরকারি কলেজের সংখ্যা অনেক বেশি। প্রায় ৬০০টি বেসরকারি কলেজে শিক্ষকতার প্রশিক্ষণ নেন লক্ষাধিক ছাত্র-ছাত্রী। এগুলো তদারকি করার দায়িত্ব বাবা সাহেব অম্বেদকর এডুকেশন ইউনিভার্সিটির। গোটা দেশে এরকম বিশ্ববিদ্যালয় আছে চারটি। 

বি এড কলেজের অনুমোদন তথা স্বীকৃতির পুনর্নবীকরণের জন্য আবেদন গ্রহণের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল এবছর ৫ আগস্ট থেকে। ৩১ জুলাইয়ের বিজ্ঞপ্তিতেই স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেওয়া হয়েছিল, কোন কোন মানদণ্ড পূরণ করা আবশ্যিক। গত ৩০ অক্টোবর অনুমোদন পুনর্নবীকরণের জন্য প্রয়োজনীয় তথ্য-সহ অনলাইনে আবেদনের শেষ দিন ছিল।

নতুন শিক্ষাবর্ষ শুরুর মুখে ২৫৩টি কলেজের পড়ুয়াদের পড়ীক্ষায় না বসতে দেওয়ার সিদ্ধান্তে হইচই শুরু হয়েছে। অনেকের অভিযোগের তির উপাচার্য ডঃ সোমার দিকে। বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের কাজকর্ম সচল রাখতে তাঁর মত কিছু উপাচার্য ও অভিজ্ঞকে রাজ্যপাল-আচার্য সাময়িক উপাচার্যের দায়িত্ব দিয়েছেন। সে ব্যাপারে আচার্য রাজ্যের অনুমতি না নেওয়ায় ক্ষুব্ধ রাজ্যের শিক্ষা দফতর। তারা আদালতে যায়। আদালত এই অস্থায়ীদের সরানোর কোনও নির্দেশ না  দিলেও শিক্ষামন্ত্রী প্রকাশ্যেই এঁদের নানাভাবে তোপ দেগে ‘অনুপ্রবেশকারী’ বলে মন্তব্য করেছেন। এই মুহূর্তে এমনিতেই তাঁরা শিক্ষা দফতরের চোখে দুয়োরানি। ডঃ সোমাকে তাই খলনায়িকা বানাতে উঠেপড়ে লেগেছেন শিক্ষামন্ত্রীর ঘনিষ্ঠ বলে চিহ্ণিত ২-১জন তথাকথিত প্রভাবশালী। 

পিছিয়ে যাওয়ার পাত্রী নন ডঃ সোমা। কেন এত কড়া পদক্ষেপ নিতে গেলেন? এর জন্য বেশ কিছু পড়ুয়া সঙ্কটে পড়বে না? ডঃ সোমা জানান, “কলেজগুলোয় প্রতি ৫০ পড়ুয়াপিছু ৮ জন শিক্ষক থাকার কথা। অনেক ক্ষেত্রেই তা থাকছে না। গত শিক্ষাবর্ষের চূড়ান্ত পরীক্ষার আগেও বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ এনসিটিই-র আইন যারা মানেনি, সেই সব প্রতিষ্ঠানের ছাত্রছাত্রীদের পরীক্ষায় বসার অনুমতি দেয়নি। এতে নানা দিক থেকে চাপ তৈরির চেষ্টা হয়েছে।

বিএড বিশ্ববিদ্যালয় এ বছর শুরুতে সেই এনসিটিই-র নিয়মের কথা স্মরণ করিয়েও দিয়েছিল কলেজগুলিকে। এর পরেও বেশ কয়েকটি ক্ষেত্রে কলেজের তরফে ভুয়া শিক্ষক দেখানো হয়েছে বলে অভিযোগ। এই ধরনের বহু অভিযোগ বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছে জমা পড়াতেই কলেজগুলিতে এনসিটিই নির্ধারিত বিধি কার্যকর করতে তৎপর হয় বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। যার উল্লেখও রয়েছে জুলাই মাসের বিজ্ঞপ্তিতে।“

উপাচার্যর অভিযোগ, “বি এড কলেজগুলোয় শিক্ষকদের নির্ধারিত সম্মাদক্ষিণা নিয়মিত সরাসরি তাঁদের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে জমা পড়ার কথা। কিন্তু বেসরকারি বেশ কিছু বিএড কলেজে তা একেবারেই মানা হচ্ছে না। এসবের নেপথ্যে রয়েছে নানা দুর্নীতি। কখনও এসব নিয়ে হইচই হলে আমরা কী উত্তর দেব?
দ্বিতীয়ত, অগ্নিসুরক্ষাবিধির আবশ্যিকতা মানছে না অনেক কলেজ। কোনও কলেজে আগুন লেগে যদি প্রাণহানি হয়, তার দায় তো বিশ্ববিদ্যালয়ের ওপরেও এসে পড়বে! শিক্ষা দফতরই তো প্রশ্ন তুলবে কেন আমরা এসব না দেখে সংশ্লিষ্ট কলেজকে স্বীকৃতি দিয়েছি?”

এনসিটিই আইনে  বিভিন্ন আবশ্যিকতার মধ্যে লেখা আছে  ১) lay down guidelines for compliance by recognized institutions, for starting new courses or training, and for providing physical and instructional facilities, staffing pattern and staff qualification.

২) take all necessary steps to prevent commercialization of teacher education।

উপাচার্যের কথায়, আমরা গত কয়েক বছর ধরে ক্রমাগত কলেজগুলোকে বলছি এনসিটিই-র নিয়মাবলী মেনে চলতে। যাঁরা এই আইন মেনে চলার পক্ষপাতী নন, তাঁরাই নিজেদের ক্ষুদ্র স্বার্থসিদ্ধির জন্য চেঁচামেচি শুরু করেছেন। প্রশাসন ও রাজনীতির শীর্ষস্তরে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ আছে, এমন একটি নামী ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান বিএড কলেজ চালায়। তাদের তরফে আমার কাছে এসে অগ্নিসুরক্ষার বাধ্যবাধকতা মুকুব করার অনুরোধ করেছিল। যুক্তি হিসাবে বলেছিলেন, “একটা ফায়ার লাইসেন্স পেতে ১০ লক্ষ টাকা ঘুষ দিতে হচ্ছে। এটা দেওয়া আমাদের সম্ভব নয়।“ আমি জবাবে বলেছি, আমরা বিশেষ ক্ষেত্র হিসাবে আপনাদের অনুমতি দিলে অন্য প্রতিষ্ঠান তার যুক্তিতে যদি আইনি পথ নেয় বা অপবাদ ছড়ায়, কীভাবে সেই ঝুঁকি নেব?

প্রতি বছরই সরকারি অনুমোদন পুনর্নবীকরণের জন্য আবেদন করতে হয় এই বেসরকারি কলেজগুলিকে। এ বছর সেই আবেদনের আগেই এনসিটিই-র আইনের কথা বিশ্ববিদ্যালেয় তরফে জানিয়ে দেওয়া হয়। ৪ অক্টোবর ছিল অনুমোদনের জন্য আবেদন জমা দেওয়ার শেষ দিন। জমা পড়া আবেদন যাচাই করে দেখা যায়, বেসরকারি কলেজগুলির মধ্যে প্রায় সাড়ে তিনশোটি কলেজ নিয়ম মেনেছে। নিয়ম মানা হয়েছে সরকারি বিএড কলেজগুলিতেও। ৩১ হাজারের ওপর পড়ুয়া এর ফলে ভর্তির সুযোগ পেয়েছেন। যে সব পড়ুয়া বা কলেজ তা মানেনি, তাদের পরীক্ষায় বসার সুযোগ দেওয়া হবে না। তারা জোট বেঁধে বৈঠক করে ভুল বোঝাচ্ছে। যথাসম্ভব চাপ তৈরি করছে। আমার বাবা ছিলেন পদস্থ সেনাকর্তা। শৈশব থেকে আইন ও শৃঙ্খলা আমার অস্থিমজ্জার মধ্যে গেঁথে গিয়েছে। আমার পক্ষে আইনি বাধ্যবাধকতার সঙ্গে আপোষ করা সম্ভব নয়।

উপাচার্য বলেন, কলেজগুলোয় নয়া শিক্ষাবর্ষে ভর্তির শেষ তারিখ আগেই প্রকাশ্যে ঘোষণা করা হয়েছিল। ওয়েবসাইটেও সব কিছুর উল্লেখ আছে। তা সত্বেও তারিখ পেরিয়ে যাওয়ার পরেও দালালদের মাধ্যমে বেশি টাকা দিয়ে বেশ কিছু পড়ুয়া বিভিন্ন কলেজে ভর্তি হয়েছেন। এই সব দালালের মধ্যে কিছু তথাকথিত শিক্ষাবিদ আছেন, যাঁরা কোনওদিন ক্লাশ নেন না। প্রভাব খাটিয়ে এই সব অনিয়মে ইন্ধন যোগান। পড়ুয়াদের উস্কানি দেন বিশ্ববিদ্যালয়ের বিরুদ্ধে। এগুলো বন্ধ করাটাও তো আমাদের কর্তব্য! গতবারও আমরা এনসিটিই-র আইনের কঠোর রূপায়ণ করতে গিয়ে শেষ মুহূর্তে খুব সমস্যায় পড়েছিলাম।

শিক্ষা দফতরের তরফে অবশ্য দাবি করা হয়েছে, কিছু কলেজের অধ্যক্ষরা জানিয়েছেন, কলেজে শিক্ষক ঘাটতির জন্য তাঁরা কোনওভাবেই দায়ী নন। কারণ অনেক সময় কিছু শিক্ষক চলে গিয়েছেন। শিক্ষক নিয়োগ করার জন্য তাঁরা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন করেছেন। কিন্তু, সেই জন্য ইন্টারভিউয়ের সময় পাননি। তাঁরা পুনর্নবীকরণের সময় বৃদ্ধি করার জন্যও আবেদন করেছিলেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *