প্রকাশিত হল ঐতিহ্যবাহী ময়নাগড় রাজবাড়ি ও বাহুবলেন্দ্র রাজবংশের উপর নির্মিত তথ্যচিত্র

পার্থ খাঁড়া, আমাদের ভারত, পূর্ব মেদিনীপুর, ২৮ নভেম্বর: পবিত্র রাসপূর্ণিমার পুণ্য লগ্নে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশিত হল এবং প্রদর্শিত হল ইতিহাস বিজড়িত ঐতিহ্যবাহী ময়নাগড় রাজবাড়ি ও বাহুবলেন্দ্র রাজবংশের উপর নির্মিত এক গবেষণালব্ধ তথ্য চিত্র। আঠারো মিনিটের তথ্যচিত্রটি প্রদর্শিত হয় ময়নাগড়ের রাজবাড়ির কুলদেবতা শ্রী শ্রী শ্যামসুন্দর জীউ-এর মন্দির প্রাঙ্গণে। উদ্বোধক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ময়না ব্লকের সমষ্টি উন্নয়ন আধিকারিক সমীর পান। এই আনন্দঘন মুহূর্তে উপস্থিত ছিলেন রাজপরিবারের বর্ষীয়ান সদস্য জীবানন্দ বাহুবলেন্দ্র এবং ময়নার বিশিষ্ট গবেষক ও প্রাক্তন প্রধান শিক্ষক রবি সামন্ত, তথ্যচিত্রটির পরিচালক অধ্যাপক ড: প্রণব সাহু, রাজপরিবারের সদস্য ড: সিদ্ধার্থ বাহুবলেন্দ্র। এছাড়াও উপস্থিত ছিলেন ইতিহাস গবেষক, সাহিত্যিক, বর্ষীয়ান শিক্ষক, শিক্ষিকা, অধ্যাপক ও অন্যান্য গবেষকগণ ও রাজপরিবারের সদস্যবৃন্দ।

তথ্যচিত্রটি নির্মাণের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল মেদিনীপুরের পরিবেশ গবেষণা সংস্থা ট্রপিক্যাল ইনস্টিটিউট অফ আর্থ অ্যান্ড এনভারমেন্টাল রিসার্চ (টীয়ার) নামক সংস্থারকে। সংস্থাটির ১০ জন গবেষক প্রায় দু’মাস ধরে পুঙ্খানুপুঙ্খ ক্ষেত্র সমীক্ষা করেন এবং চার মাস ধরে গবেষণা পত্র তৈরী করেন। ইতিহাসবিদ, সাহিত্যিক, ভৌগোলিক, পরিবেশবিদ এবং ভূতত্ত্ববিদের সমন্বয়ে গঠিত এই দলটি ময়নাগড়, বালিসীতা গড় এবং পারিপার্শ্বিক এলাকার ভৌগোলিক সমীক্ষা করেন। সমীক্ষা এবং গবেষণার ভিত্তিতে ১৮ মিনিটের এই তথ্যচিত্রটি নির্মাণ করা হয়।
গবেষণা সংস্থার সম্পাদক, ভৌগোলিক এবং পরিবেশবিদ অধ্যাপক ডঃ প্রণব সাহু তথ্য চিত্রটি পরিচালনা করেছেন। তিনি জানান, ময়নাগড় জনপদ ধর্মরাজ লাউসেনের পদার্পণ সময় থেকে বাহুবলেন্দ্র রাজবংশ প্রায় এক হাজার বছরের ইতিহাস রয়েছে, তাছাড়া ময়নাগড় পরিবেশের বিবর্তনের এক বিশেষ ভৌগোলিক অঞ্চল। মূলত ইতিহাস, সাহিত্য দার্শনিক চিন্তা, ভৌগোলিক পরিবেশ, জীব বৈচিত্র্য এবং ধর্মীয় ঐতিহ্যের মতো বিভিন্ন বিষয়গুলি গবেষণার ভিত্তিতে এই তথ্যচিত্রটি নির্মাণ করা হয়। এটি একটি মধ্যযুগীয় রাজবংশ। এই ময়নাগড়ে ‘ধর্মমঙ্গল’ খ্যাত ধর্মরাজ লাউসেন পদার্পণ করেন। তার ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক দিকগুলি তুলে ধরা হয়েছে এই তথ্য চিত্রে। সেই সঙ্গে প্রায় ৫৫০ বছরের পুরনো বাহুবলেন্দ্র রাজবংশ এবং ময়নাগড়ের ইতিহাস এবং পরিবেশের বিবর্তন উল্লেখযোগ্য ভাবে তুলে ধরা হয়েছে এই তথ্য চিত্রে। ক্ষেত্রসমীক্ষা, পরীক্ষা- নিরীক্ষার পাশাপাশি কৃত্রিম মেধার মাধ্যমে বিভিন্ন তথ্য এবং প্রমাণ তথ্যচিত্রে প্রকাশিত হয়েছে।

অধ্যাপক ড: প্রণব সাহু জানান, এই ঐতিহ্যবাহী স্থানটি একটি দুর্গম স্থান। বহিঃশত্রুর আক্রমণ থেকে এই গড় যে সব থেকে নিরাপদ, তা বিভিন্ন সময়ে প্রমাণ মেলে। শুধু তাই নয়, সর্বধর্ম সমন্বয়ের ক্ষেত্রে এই ঐতিহ্যবাহী রাজবংশ নানান অনুষ্ঠানের মাধ্যমে আজও তার ঐতিহ্য বহন করে চলেছে। জীব বৈচিত্রের এক তপ্ত বিন্দু এবং কংসাবতী, কেলেঘাই নদীর এবং চন্ডী খাল প্রতিটি জলভাগের সঙ্গে নৌ পরিবহনের মাধ্যমে যোগাযোগ স্থাপন ছিল। তেমনি বাবা লোকেশ্বর মন্দির এবং শ্যামসুন্দর জিউর মন্দির ঐতিহ্যবাহী মন্দিররূপে আজও রাজবংশের ঐতিহ্য ধরে রেখেছে। অধ্যাপক প্রণব সাহু এবং গবেষণা সংস্থার সকল গবেষক মনে করেন এই প্রাচীন ঐতিহ্যবাহী স্থানটি ইউনেস্কো ক্লাবের অন্তর্গত হওয়া উচিৎ। সেইসঙ্গে পরিবেশবান্ধব পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে এবং হেরিটেজ পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ পাক। এই গবেষণায় যারা যুক্ত ছিলেন তারা হলেন বিশিষ্ট কৃষি বিজ্ঞানী ও ইউনেস্কো সমন্বয়কারী সদস্য অধ্যাপক ডঃ কাঞ্চন ভৌমিক, অধ্যাপক ডঃ চন্দন করণ, অধ্যাপিকা বৈশালী গুহ, অধ্যাপক সৌমেন্দু দে, পরিবেশ কর্মী শরৎ চ্যাটার্জি, মনীষা ভৌমিক, সৌমিত্র পাত্র, প্রসারী চন্দ ও অন্যান্য বিশিষ্ট গবেষকগণ। আকাশ চিত্র সংগ্রাহকের কাজ করেছেন বিপ্লব নায়েক। তথ্যচিত্রে কন্ঠ দান করেছেন প্রসারী চন্দ। আবহ সঙ্গীতে সাহায্য করেন দেবদুলাল সাউ।

রাজপরিবারের ১৪ তম সদস্য ড: সিদ্ধার্থ বাহুবলেন্দ্রর একান্ত আন্তরিকতায় এই অনুষ্ঠান সফল ভাবে আয়োজিত হয়। তিনি নিজেও একজন গবেষক। ড: সিদ্ধার্থ বাহুবলেন্দ্র জানান, ‘এই তথ্যচিত্রটিতে সর্বাঙ্গীণ ও সামগ্রিক বিষয় যেভাবে তুলে ধরা হয়েছে এবং প্রকাশিত হয়েছে তার যথেষ্ট গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে। আমাদের এই তথ্য চিত্র আন্তর্জাতিক স্তরে পৌঁছে যাবে সেই আশা রাখছি।”

জীবানন্দ বাহুবলেন্দ্র ও বিশিষ্ট ময়না লোকসাহিত্যের গবেষক গৈরিক গজেন্দ্র মহাপাত্র এবং অন্যান্য বিশিষ্ট বৃন্দ মনে করেন এটি একটি তথ্য ও প্রমাণ যুক্ত আকর্ষণীয় তথ্য চিত্র। রাজ পরিবারের রানীমা প্রতিমা দেবী এবং বর্তমান প্রজন্মের রানীমা শ্রাবনী দেবী তথ্য চিত্র নির্মানকারী দলকে বিশেষ সাধুবাদ জানান। সমষ্টি উন্নয়ন আধিকারিক সমীর পান জানান, তথ্যচিত্রটি সংক্ষিপ্ত সময়ের মধ্যে ময়নাগড় ও রাজ পরিবারের ইতিহাস, ঐতিহ্য, ভৌগলিক পরিবেশ এবং ধর্মীয় সংহতি ও মিলনের কথা যেভাবে তুলে ধরা হয়েছে তা বর্তমানে যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ। এই তথ্য চিত্র আগামী দিনে ঐতিহ্যকে টিকিয়ে রাখতে এবং ময়নাগড়ের ইতিহাস, ঐতিহ্য ভারত তথা পৃথিবীর সামনে তুলে ধরতে যথেষ্ট সাহায্য করবে। সাংবাদিকদের প্রশ্নে স্থানীয় গবেষক ও সাহিত্যিকরা বলেন, এটি একটি অনবদ্য ও সর্বাঙ্গীণ তথ্যচিত্র। স্বল্প সময়ে ময়নার ইতিহাস যেভাবে তুলে ধরা হয়েছে তা জ্ঞান পিপাসু মানুষের কাছে যথেষ্ট গ্রহণযোগ্য হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *