অমানবিক অত্যাচার! আউশগ্রামের ঘরছাড়া ২৬টি বিজেপি পরিবারের দিন কাটছে জঙ্গলে

জয় লাহা, দুর্গাপুর, ৮ জুন:  হিংসার রোষানলে ভাঙ্গচুর হয়েছে ঘরবাড়ি। লুট হয়েছে বাড়ির জিনিসপত্র। চাষ করা ধান পচে নষ্ট হচ্ছে মাঠে। তুলে নিয়ে গেছে চাঢের জমিতে জল দেওয়ার সাবমার্শিবাল পাম্প। শুধু তাই নয়, অমানবিক নির্যাতনের শিকার মহিলারা। ভোটের ফল বেরোনোর একমাস পরও আতঙ্কে বিজেপিকর্মীদের দিন কাটছে জঙ্গলের পাশে তাবুতে। এমনই মার্মান্তিক ঘটনাটি আউশগ্রামের প্রেমগঞ্জে। গ্রামের প্রায় ২৬ টি পরিবার গ্রামছাড়া। আতঙ্কে তাদের দিন কাটছে জঙ্গলে। দুটো তাবুতে ১৪ জন মহিলা, ১০জন শিশু সহ ২৬ টি পরিবার অসহায় ভাবে দিন কাটাচ্ছে। অভিযোগের আঙ্গুল তৃণমূল আশ্রিত দুস্কৃতিদের দিকে। অসহায় বিজেপিকর্মীদের পাশে দাঁড়াল আউশগ্রামের সিপিআইএমএল রেডস্টার। 

গত ২ মে বিধানসভার ফলাফল ঘোষনার পরই রাজ্যজুড়ে রাজনৈতিক হিংসার ঘটনা শুরু হয়। বিজেপিকর্মীদের ঘরবাড়ি ভাঙ্গচুর করে আগুন ধরিয়ে দেওয়া এবং লুঠপাটের অভিযোগ ওঠে। হিংসার আগুন থেকে রেহাই মেলেনি জঙ্গলমহলের আউশগ্রামের প্রেমগঞ্জে বিজেপিকর্মীদের। প্রেমগঞ্জের বাগদীপাড়ার প্রায় ২৮ টি পরিবার বছর সাতেক ধরে বিজেপি করছিলেন। এবারের বিধানসভা ভোটেও সামিল ছিলেন। কিন্তু ফলফল ঘোষনা হতেই তাদের ওপর অমানবিক আক্রমন শুরু হয় বলে অভিযোগ। আক্রান্ত বিজেপিকর্মীরা আতঙ্কে গ্রামছাড়া। কেউ ভিন জেলায় আত্মীয়ের বাড়িতে, কেউ পাশের গ্রাম ভাতকুন্ডার এক প্রান্তে তাবু খাটিয়ে দিন যাপন করছেন। ঝড় বৃষ্টিতে প্লাস্টিকের তাবুই একমাত্র সম্বল।

কী হয়েছিল ঘটনা? গ্রামছাড়া আক্রান্ত সুভাষ বাগদী, ধর্মদাস বাগদী, দুলাল বাগদী জানন, “আমরা বিজেপি করতাম। ২ মে রাতের ঘটনা। খেলা হবে সুরে তারস্বরে মাইক বাজিয়ে গ্রামে তৃণমূলের বিজয় উল্লাস চলছিল। হাতে আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে ক্ষমতার আস্ফালন। তারপরই বিজেপি করার অপরাধে আমাদের বাড়িতে নির্বিচারে আক্রমন শুরু হয়। রাতের মধ্যে তৃণমূল আশ্রিত দুষ্কৃতিরা তান্ডব শুরু করে। বাড়িঘর ভাঙ্গচুর, বেপরওয়া লুঠপাট শুরু করে। ঘটনার নির্মমতা দেখে আতঙ্কিত হয়ে পড়ি।” আক্রান্তরা জানান, “বাড়ির মহিলাদের ওপর চলে জনসমক্ষে একপ্রকার বিবস্ত্র করে অত্যাচার। অশালীন অমানবিক আচরণ। রাতের অন্ধকারে বৃষ্টির মধ্যে প্রাণভয়ে বাড়ি ছেড়ে পালিয়ে যাই। পরদিন খবর পাই বাড়ির গরু, ছাগল সব বিক্রি করে দিয়েছে। লুঠপাট করেছে বাড়িতে। ভোটার কার্ড, আধার কার্ড সবই লুট করেছে, এমনকি ভাঙ্গচুরের পর বাড়ির সামন্য অস্তিত্বটুকুও নেই। প্রায় ১৬ বিঘা মাঠের বোরো ধান কাটতে দেয়নি। ধান কাটতে না দেওয়া ঝড়বৃষ্টিতে মাঠেই পচে নষ্ট হয়েছে ধান। মাঠের সাবমার্শিবাল তুলে নিয়েছে। নতুন করে ঘরবাড়ি করে বেঁচে থাকার রসদটুকুও নেই। কোনওভাবে একবেলা খেয়ে দিন কাটছে।”

ঘরছাড়া বিজেপিকর্মীরা দলীয় নেতৃত্বের বিরুদ্ধে একরাশ ক্ষোভ উগরে জানান, “ঘটনার পর থেকে ত্রাণের ব্যবস্থা দুরস্ত, খোঁজ খবর নিতেও কেউ আসেনি।”

এদিকে ঘরছাড়া বিজেপিকর্মীদের পাশে দাঁড়িয়েছে সিপিআইএমএল (রেডস্টার)। ঘরছাড়া ২৬ টি পরিবার পার্শ্ববর্তী ভাতকুন্ডা গ্রামের একপ্রান্তে তাবু খাটিয়ে বাস করছেন। ওই সব পরিবারে ১৪ জনের মত মহিলা রয়েছে। ১০ জনের মত শিশু রয়েছে। ঝড় বৃষ্টির মধ্যে তাবুর মধ্যে  কোনওভাবে রয়েছেন। তাদের খাবারের ব্যবস্থা করেছে সিপিআইএমএল। ইতিমধ্যে অত্যাচারের প্রতিবাদ জানিয়ে সুবিচারের দাবিতে পুলিশ ও প্রসাশনের দ্বারস্থ হয়েছে ওই সংগঠন।

সিপিআইএমএল (রেডস্টার) সংগঠনের বর্ধমান জেলা সম্পাদিকা ফতেমা বেগম জানান, “ঘরছাড়া পরিবারগুলো আতঙ্কিত। দুটো তাবুতে অসহায় অবস্থায় দিন কাটছে। সহায় সম্বল বলতে কিছুই নেই। প্রশাসনের কাছে অভিযোগ জানিয়েছি। দ্রুত তাদের নিরাপত্তা দিয়ে বাড়ি ফেরানোর দাবি জানিয়েছি। ওইসব পরিবারে ত্রাণের ব্যবস্থা করতে বলা হয়েছে। তাদের বাড়ি তৈরী করে দেওয়ার দাবি জানিয়েছি। নতুন করে বেঁচে থাকতে তাদের সবরকম সহযোগিতার দাবি জানিয়েছি। দাবি না মানলে আন্দোলন শুরু হবে।”

বিজেপির জেলা নেতা রমন শর্মা বলেন, “আক্রান্ত কর্মীদের পাশে আছি। নিয়মিত যোগাযোগ রয়েছে।” অন্যদিকে অভিযোগ অস্বীকার করে তৃণমূলের আউশগ্রামের ব্লক সভাপতি রামকৃষ্ণ ঘোষ জানান, “মিথ্যা অভিযোগ। ওইসমস্ত পরিবারের ধান আমি নিজে মেশিন পাঠিয়ে কাটিয়ে বাড়িতে পৌঁছানো করিয়েছি। ঘরছাড়াদের বাড়ি ফিরতে বলেছি। অনেকে বাড়ি ফিরেছে। কয়েকজন ফিরছে না।’

অন্যদিকে বর্ধমান জেলা পুলিশ সুপার কামনাশীষ সেন বলেন, “জেলায় ৭১২ টির মতো এধরনের অভিযোগ এসেছিল। তারমধ্যে ৯৫ শতাংশ ঘরছাড়াদের বাড়ি ফেরানো হয়েছে। প্রেমগঞ্জের বিষয়টি খোঁজ নিয়ে দেখা হচ্ছে।” 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *