জয় লাহা, দুর্গাপুর, ২৭ আগস্ট: বিক্রির আগে অত্যাধুনিক আগ্নেয়াস্ত্র সহ পুলিশের জালে ধরা পড়ল পাচারকারী। ঘটনাকে ঘিরে রীতিমতো শোরগোল পড়ছে খনি অঞ্চল পান্ডবেশ্বরে।
পুলিশ সুত্রে জানাগেছে, ধৃতের নাম সুনীল পাশওয়ান ওরপে সোলে। পান্ডবেশ্বর রামনগর ৩ কোলিয়ারী এলাকার বাসিন্দা। তার কাছ থেকে একে-৪৭, এসবিবিএলের মতো আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধার করে পুলিশ। শনিবার তাকে দুর্গাপুর মহকুমা আদালতে তোলা হলে বিচারক তার জামিন খারিজ করে দেন।
প্রসঙ্গত, গত কয়েকদিন ধরে অন্ডাল, পান্ডবেশ্বরে আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধারে সক্রিয় হয়েছে কমিশনারেট পুলিশ। গত মঙ্গলবার উখড়া গ্রামের আনন্দ মোড় সংলগ্ন শ্মশান এলাকা থেকে হরিসাধন ঘোষ ও তপন বাউরি নামে দু’জনকে গ্রেফতার করেছিল পুলিশ। তাদের কাছ থেকে উদ্ধার হয়েছিল আগ্নেয়াস্ত্র। আদালতে তাদের নিজ হেপজতে নেয় পুলিশ। তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করে দু’দিন পর আবারও উখড়া গ্রামের বাউরি পাড়া থেকে আগ্নেয়াস্ত্র-সহ গ্রেপ্তার হল সুভাষ ধীবর নামে একজন। তার কাছ থেকে উদ্ধার হয়েছে একটি সেভেন এমএম পিস্তল, ৪ রাউন্ড কার্তুজ ও দুটি ম্যাগাজিন। শুক্রবার গোপনসুত্রে খবর পেয়ে পান্ডবেশ্বরের রামনগর-৩ কোলিয়ারী এলাকায় হানা দেয় পুলিশ। সেখানে অত্যাধুনিক আগ্নেয়াস্ত্র হাত বদলের আগে এক কারবারিকে গ্রেফতার করে কমিশনারেট পুলিশের গয়েন্দা বিভাগ। ধৃতের নাম সুনীল পাশওয়ান ওরফে সোলে ওই এলাকারই বাসিন্দা। পুলিশ জানিয়েছে, তার কাছ থেকে অত্যাধুনিক ১ টি একে-৪৭, ১ এসববিবিএল, ২ টি কার্বাইন, ১ টি পাইপগান, ৮ টি কার্তুজ উদ্ধার হয়েছে। শনিবার দুর্গাপুর ডিসি অফিসে সাংবাদিক সম্মেলন করেন আসানসোল – দুর্গাপুর পুলিস কমিশনারেটের ডিসি (পূর্ব) অভিষেক গুপ্তা জানান, “বিক্রির আগেই খবর পেয়ে অভিযান চালানো হয়। তখনই তল্লাশিতে আগ্নেয়াস্ত্রগুলি উদ্ধার হয়েছে।”
প্রশ্ন, কে এই সুনীল ওরফে সোলে? গতবছর আগষ্টের গোড়াতে পান্ডবেশ্বরের খোট্টারডিহি এলাকায় নাকা চেকিং চালানোর সময় পুলিশি অভিযানে অত্যাধুনিক আগ্নেয়াস্ত্র সহ ধরা পড়ে সুনীল। তখন একটি কার্বাইন ও কার্তুজ উদ্ধার হয়। তাকে জেরা করে শিবু পাশওয়ান নামে একজনকে আগ্নেয়াস্ত্র সহ গ্রেফতার করে পুলিশ। উদ্ধার হয় নাইন এমএম কার্বাইন, পিস্তল, রাইফেল ম্যাগজিন। জানা গেছে, ২০০২ -১৯ সাল পর্যন্ত কয়লা ও বালি মাফিয়া জগতের কিংপিন নুর আলমের বডি গার্ড ছিল সুনীল। তখন থেকে অস্ত্র পাচারে হাতে খড়ি। নুর আলম মারা যাওয়ার পর সুনীলের অপরাধ ও অসামাজিক কার্যকলাপে বাড় বাড়ন্ত শুরু হয়। খনি অঞ্চলে আগ্নেয়াস্ত্র ভান্ডার নতুন কোনো ঘটনা নয়।
প্রসঙ্গত, রামপুরহাটের বগটুই গ্রামে নির্মম হত্যাকান্ডে গোটা দেশজুড়ে নিন্দার ঝড় ওঠে। ঘটনার পর মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় পুলিশকে রাজ্যজুড়ে বেআইনি অস্ত্র উদ্ধারের কড়া নির্দেশ দেন। তারপরই তৎপর হয় রাজ্য পুলিশ। রাজ্যের বিভিন্ন থানা এলাকা থেকে প্রচুর বেআইনী অস্ত্র ও বোমা উদ্ধার হয়। তারপর পাণ্ডবেশ্বরের ডালুরবাঁধ ৮ নং এলাকায় পুলিশ অভিযান চালায়। স্থানীয় সঞ্জয় মোদী নামে এক ব্যাক্তির বাড়ি থেকে উদ্ধার হয় ৭০ রাউন্ড কার্তুজ ও ছ’টি দেশি রাইফেল। বেআইনি আগ্নেয়াস্ত্র মজুত করার অভিযোগে গ্রেফতার করা হয় সঞ্জয় মোদীকে। দুর্গাপুর নিউটাউনশিপ থানার এমএএমসি এলাকায় অনিল ভারতী নামে এক যুবককে আগ্নেয়াস্ত্র সহ গ্রেফতার করে পুলিশ। ধৃতের কাছ থেকে একটি পিস্তল ও দু’রাউন্ড কার্তুজ উদ্ধার করে। তার আগে আসানসোলের সালানপুর অস্ত্র কারখানার হদিশ পায় পুলিশ।
অতীতে ২০১১ সালে রাজ্যে পালাবদলের আগে প্রচুর বেআইনী অস্ত্র উদ্ধার হয় খনি অঞ্চলে। দুর্গাপুর-ফরিদপুর ব্লকের মাধাইগঞ্জের জঙ্গলে একে-৪৭ এর মতো প্রচুর আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধার হয়েছিল। গত ফেব্রুয়ারি মাসের প্রথম সপ্তাহে বুদবুদের মসজিদতলা এলাকায় এক মাংস বিক্রেতার বাড়ি থেকে উদ্ধার হয় আগ্নেয়াস্ত্র। দেশী পিস্তল সহ ধৃতদের নাম শেখ শানওয়ার ও মহঃ মুস্তাক নামে দুজনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। অভিযোগ মাংস বিক্রির আড়ালে চলত আগ্নেয়াস্ত্র বিক্রি। বিজেপি নেতা জিতেন্দ্র তেওয়ারী বলেন,” পুলিশ দলদাস এটাই প্রমাণ করে। মুখ্যমন্ত্রী বলবে তারপর অস্ত্র উদ্ধার করবে পুলিশ। দেশে আইপিএসি, সিআরপিসি’র মত ধারা রয়েছে। পুলিশ কারও নির্দেশ ছাড়া যে কোনো সময় বেআইনী অস্ত্র উদ্ধারে অভিযান চালাতে পারে। অথচ পুলিশ সেটা করে না।” তিনি আরও বলেন, “যেভাবে অস্ত্র উদ্ধার হচ্ছে, তাতে রাজ্য পুলিশের গয়েন্দা বিভাগের ব্যর্থতার পরিচয় দেয়। ওই এলাকার বর্তমান বিধায়ক বিমানবন্দরে আগ্নেয়াস্ত্র সহ ধরা পড়েছিল। রাজ্যের শাসকদল পঞ্চায়েত ভোটের প্রস্তুতি নিচ্ছে। এসব আগ্নেয়াস্ত্র আসছে কোথা থেকে? সেটা খুঁজে বের করুক পুলিশ।”
যদিও অভিযোগ অস্বীকার করেছেন দুর্গাপুর ফরিদপুর ব্লকের তৃণমূল নেতা সুজিত মুখার্জি। তিনি বলেন,
“তৃণমূল কোনো ভাবে এধরনে কার্যকলাপে মদত দেয় না। পুলিশ বেআইনী অস্ত্র উদ্ধারে সক্রিয়।” প্রশ্ন, এধরনের আগ্নেয়াস্ত্র খনি অঞ্চলে কিভাবে কোথা থেকে এসেছে?
যদিও ডিসি (পূর্ব) অভিষেক গুপ্তা জানান,
“ধৃতকে নিজ হেপাজতে নেওয়া হয়েছে। জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। কি উদ্দেশ্যে কোথা থেকে এধরনের আগ্নেয়াস্ত্র পেয়েছে। ঘটনার তদন্ত চলছে।”

